ফরিদপুরের মধুখালীতে স্কুলে যাওয়ার পথে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে চার যুবকের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মে ব্যবহৃত রাসায়নিক তরল পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ে ওই কিশোরী। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসার পর গত ২৬ অক্টোবর রাতে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করেছে বলে দাবি পরিবারের। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর একাধিক থানায় যোগাযোগ করেও শুরুতে মামলা করতে পারেনি তারা। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে এবং ধর্ষণের অভিযোগের পক্ষে ঘটনাস্থলে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে মধুখালী থানা।
মারা যাওয়া কিশোরী ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের বাসিন্দা। সে স্থানীয় একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টার দিকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় কিশোরী। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাজধরপুর এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে খোঁজাখুঁজি করেও তখন তার সন্ধান পাননি।
পরিবারের অভিযোগ, পরে তাকে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামের মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় নিয়ে তিন যুবক ধর্ষণ করে। আরেক যুবক তাদের সহযোগিতা করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে অভিযুক্তদের কাছ থেকে পালিয়ে কিশোরী নদীতে ঝাঁপ দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে রাসায়নিক তরল পান করে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে পুলিশ ও পরিবারের বক্তব্যে জানা গেছে।
পরে পুলিশের সহযোগিতায় তাকে মাগুরা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসা শেষে পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর থেকে শারীরিক নানা জটিলতা নিয়ে বাড়িতেই তার চিকিৎসা চলছিল। গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে কিশোরী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছে বলে দাবি পরিবারের। ভিডিওতে তাকে মোটরসাইকেলে তুলে নেওয়া এবং নির্যাতনের অভিযোগ করতে শোনা যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কিশোরীর মৃত্যুর পর শোকাহত পরিবারটির সদস্যরা বিচার দাবি করেছেন। তার মা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর মধুখালী থানা পুলিশ পরিবারের সদস্যদের শ্রীপুর থানায় পাঠায়। সেখানে লিখিত বক্তব্য নেওয়া হলেও মামলা না করে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মেয়ের খোঁজে এবং বিচার চেয়ে তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। কিন্তু দুই থানায় গিয়েও মামলা করতে পারেননি বলে অভিযোগ তার। মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ ও বিচার দাবি করেন তিনি।
কিশোরীর ভগ্নিপতি বিপ্লব শেখের অভিযোগ, ঘটনার আগে পারিবারিকভাবে অন্যত্র বিয়ের কাবিন হয়েছিল। এ নিয়ে পরিবারের এক সদস্যের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। তার দাবি, সেই বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সুস্থ হওয়ার পর কিশোরী পরিবারের কাছে নির্যাতনের কথা জানিয়েছিল। তবে তার ভবিষ্যৎ ও পারিবারিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে তখন বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি। এখন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চান তারা।
কিশোরীর বাবা সরকারের কাছে মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
যা বলছে পুলিশ
শ্রীপুর থানা পুলিশের ভাষ্য, কিশোরীর সঙ্গে অভিযুক্তদের একজনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এর মধ্যে অন্যত্র তার বিয়ে হওয়ায় বিরোধ তৈরি হয়। পুলিশের দাবি, গত ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় ওই যুবকের সঙ্গে কিশোরী দীর্ঘ সময় কথা বলে এবং পরে নদীতে ঝাঁপ দেয়। ঘাটে থাকা এক মাঝি বিষয়টি দেখে স্থানীয়দের জানান। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তার দাবি, মাটিকাটা ঘাট এলাকায় ধর্ষণের ঘটনার পক্ষে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ঘাটটি খোলামেলা এবং সেখানে মানুষের যাতায়াত রয়েছে। স্থানীয় মাঝিরাও এমন কোনো ঘটনা দেখেননি বলে জানান তিনি। তবে অন্য কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
ওসি আরও বলেন, উদ্ধারের সময় কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগ করেনি। পরবর্তী দেড় মাসেও এ বিষয়ে পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি বলে দাবি তার। মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষ্য, কিশোরীকে উদ্ধারের পর পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। পরে পুলিশ ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে সে রাসায়নিক তরল পান করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে তার মৃত্যু হয়। যেহেতু কিশোরীর মৃত্যু মধুখালী এলাকায় হয়েছে, সে কারণে ওই থানার মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ঘটনা জানার পর তারা শ্রীপুর থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পরে পরিবার শ্রীপুর থানায় গেলে সেখানে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়। কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল—এ তথ্য তারা পরে জানতে পেরেছেন বলে জানান তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান ওসি।
আইনজীবীর বক্তব্য
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূইয়া রতন বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগ থানায় গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ নেওয়ার পর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে পুলিশ। তবে থানা অভিযোগ গ্রহণ না করলে ভুক্তভোগীর পরিবার আদালতেও মামলা করতে পারে।
কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের বক্তব্য এবং প্রকাশিত ভিডিওর বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।