বাস্তব ছবিতে দেখা যায়, হিজাব ও পুরো শরীর ঢাকা পোশাক পরিহিত এক কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নারী ট্রাফিক সিগন্যাল পার হচ্ছেন। অন্যদিকে, এআই-এর তৈরি করা বিকৃত ছবিটিতে ওই নারীর শরীরে কোনো হিজাব বা বোরকা ছিল না। তার পরিবর্তে তাঁকে হাতা কাটা ট্যাঙ্ক টপ ও কার্গো প্যান্ট পরিয়ে একটি ওয়েস্টার্ন বা পাশ্চাত্য রূপ দেওয়া হয়েছিল।
জুলিয়েন ওডুল ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল 'ন্যাশনাল র্যালি'-র একজন সংসদ সদস্য। মূল ছবিটি অন্য একজন পোস্ট করার পর তিনি সেটি কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করে রি-টুইট করেন। ছবিটির মাধ্যমে ওই নারীর মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলে তাঁকে জোরপূর্বক এক পাশ্চাত্য রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি বিকৃতি এবং এআই ইমেজিং প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে ভয়াবহ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এটি এরই একটি বাস্তব চিত্র।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি, গ্রোক, জেমিনি এবং ক্লদ-এর মতো জনপ্রিয় এআই চ্যাটবটগুলোতে সাধারণ কিছু ‘প্রম্পট’ বা কমান্ড দিলেই তারা কোনো মুসলিম নারীর হিজাব বা বোরকা সরিয়ে ফেলছে—যা কোনো মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর এক চরম আঘাত ও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
চ্যাটবটগুলোর ভূমিকা ও দ্বিমুখী নীতি
ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি শুরুতেই এমন নির্দেশ পেয়ে হিজাব সরিয়ে ছবি বানিয়ে দেয়। তবে গ্রোক এবং জেমিনি প্রথমে এমন ছবি তৈরি করতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কৌশলগত বা নির্দিষ্ট কিছু প্রম্পট ব্যবহার করতেই তারা সেই বিতর্কিত ছবি তৈরি করে ফেলে।
গুগলের জেমিনি প্রথমে আসল মানুষের ছবি থেকে জামাকাপড় বা হিজাব সরাতে রাজি হয়নি। কিন্তু যখন তাকে বলা হয় "নারীটিকে পাশ্চাত্য পোশাক পরা একজন মানুষের রূপ দাও", তখনই সে হিজাব ও বোরকা ছাড়া ওই নারীর নতুন ছবি তৈরি করে দেয়।
অন্যদিকে গ্রোক চ্যাটবটটি একটি এআই-জেনারেটেড ছবি থেকে মাথা ঢাকা কাপড় (হিজাব) সরিয়ে নিলেও, পুরো পোশাক সরাতে অস্বীকৃতি জানায়। এর কারণ জানতে চাওয়া হলে চ্যাটবটটি উত্তর দেয়, "হিজাব বা মাথার কাপড় সরানোকে স্রেফ একটি সাধারণ পোশাক বা চুলের স্টাইল পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছে।"
মুসলিমবিদ্বেষ ও নারীদের আপত্তিকর উপস্থাপন
'সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট' (সিএসওএইচ)-এর গবেষণা ও প্রচার বিভাগের পরিচালক এভিয়ান লিডিগ বলেন, "এটি আলাদা কোনো ঘটনা নয়। বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে মুসলিম নারীদের যেভাবে অনলাইনে টার্গেট ও হেনস্তা করা হচ্ছে, এটি তারই একটি বিপজ্জনক ধারাবাহিকতা।"
গত বছরের অক্টোবরে সিএসওএইচ-এর একটি গবেষণার বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ১,৩২৬টি এআই-নির্মিত ইসলামফোবিক বা মুসলিমবিদ্বেষী পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই পোস্টগুলো মূলত ২৯৭টি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হতো এবং সেগুলোতে বিপুল মানুষ যুক্ত ছিলেন। ওই গবেষণায় দেখা যায়, এআই-এর মাধ্যমে ইসলামফোবিয়া ছড়ানোর অন্যতম প্রধান উপায় ছিল মুসলিম নারীদের আপত্তিকর বা যৌন উদ্দীপক রূপে উপস্থাপন করা।
নগ্নতা বন্ধের নিয়ম থাকলেও হিজাব বিকৃতিতে ছাড়!
চলতি বছরের মে মাসে গ্রোক এর প্রতিষ্ঠাতা প্রতিষ্ঠান এক্সএআই জানিয়েছিল, তাদের এআই ইমেজিং প্রযুক্তিতে এমন কিছু সেফগার্ড বা সুরক্ষাকবচ যুক্ত করা হয়েছে যাতে আসল মানুষের ছবি থেকে কেউ ডিজিটাল উপায়ে জামাকাপড় খুলে নগ্ন ছবি তৈরি করতে না পারে—এমনকি বিকিনি পরা নারীদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য।
চ্যাটজিপিটিও শুরুতে একজন নারীর ছবি থেকে জামাকাপড় সরাতে অস্বীকার করে যুক্তি দিয়েছিল যে, জামাকাপড় সরালে ওই ব্যক্তির নগ্ন শরীর প্রকাশ পাবে। তবে তারা দাবি করে, "হিজাব সরানো মানে স্রেফ মাথার এক টুকরো কাপড় সরানো।"
পরবর্তীতে অবশ্য চ্যাটজিপিটি নিজেদের ভুল স্বীকার করে মন্তব্য করে, যেসব নারী হিজাব পরেন, তাঁদের মাথার চুল বা শরীর প্রকাশ করা তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সরাসরি লঙ্ঘন হতে পারে। তারা জানায়, "একটি এআই এডিটের মাধ্যমে যদি পুরোপুরি নগ্নতা তৈরি নাও হয়, তাহলেও সেটি যে কারো মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।"
এআই গবেষক এভিয়ান লিডিগের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিমালার এই ফাঁকফোকরগুলোই সবচেয়ে বড় সমস্যার মূল। এআই চ্যাটবটগুলোর জন্য তৈরি নীতিমালায় বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে। একজন মুসলিম নারীর হিজাব সরিয়ে ফেলা সরাসরি প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা লঙ্ঘন না করলেও, তা বাস্তবে ওই মানুষটির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং চরম অপমানজনক।