ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শ শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!*

Total Views : 23
Zoom In Zoom Out Read Later Print

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ কিন্তু আমরা কি সংবিধানের এই মৌলিক অধিকারের বিধান মানছি? এই দেশে কিছু মানুষ আছেন যারা আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে। ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা অপরাধ করলেও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ান। আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। তাদের অপকর্মের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পর্যন্ত হয় না। সুশীল মুখোশ পরে এরা অনিয়ম করেন, কিন্তু কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুহত্যা নিয়ে আইনের বৈষম্য আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হলো। ঈদের আগের দিন রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। গোটা দেশ এই ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়। সরকার এই ঘটনার তদন্ত শুরু করে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বাস দেন, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার কথা রেখেছেন। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালটির নির্বাহী পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে পাঠানো এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে চিঠিটি পাঠিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ)। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপনার আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে।’

চিঠিটির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, ২ বড় মগবাজার, ঢাকা-এর কারণ দর্শানোর জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত সিদ্ধান্ত।’ চিঠিতে বলা হয়, গত ২৭ মে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন এই হাসপাতালটির ‘লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না’ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

পরে ৭ জুন বিকেল পাঁচটার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কারণ দর্শানোর সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করলে এই সময়সীমা ৯ জুন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারীকে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘৯ জুন আপনার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে জবাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গৃহীত পদক্ষেপ ছাড়াও ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে। সেই মামলার তদন্ত চলছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়, কিন্তু অতীতে কখনও স্বাস্থ্য অধিদফতর কঠোর হতে পারেনি। এধরনের ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়েছে, কিছুদিন হইচই হয়েছে, তারপর সবকিছু ধামাচাপা পড়ে গেছে। যারা বেসরকারি হাসপাতালের মালিক তারা প্রভাবশালী। যেকোন উপায়ে তারা সবকিছু ম‍্যানেজ করে নিয়েছেন। ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ক্রমশ স্বেচ্ছাচারী হয়ে গেছে। রোগীদের সেবা প্রদানের চেয়ে তারা মুনাফা লাভে বেশি ব্যস্ত। বেসরকারি হাসপাতালগুলো জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়। তাই আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো একটি প্রভাবশালী বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকার নিঃসন্দেহে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এটা শুধু আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, যেসব বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে, জনগণকে হয়রানি করে তাদের সবার জন্য এটি সতর্কবার্তা। এজন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি ধন্যবাদ পেতেই পারেন। তিনি শুরু থেকেই এই বিষয়ে সোচ্চার এবং সংবেদনশীল ছিলেন। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্ত, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

শুধু আদ্-দ্বীনের ঘটনা নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার বেশ কিছু দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে ঢাকার একটি আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। মাত্র ছয় দিনের মধ্যে এই রায় বাংলাদেশে ন‍্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত ১৯শে মে সকালে পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় নিজেদের বাসার পাশের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে রক্তাক্ত ও খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় শিশু রামিসার মৃতদেহ। এই রায় সারাদেশে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কিন্তু সব ক্ষেত্রে কি সরকার আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারছে? এই প্রশ্ন উঠেছে কারণ, হামে শিশু মৃত্যুর মিছিল যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে তখনও সরকার দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। হামে শিশু মৃত্যু ছয়শ পেরিয়ে গেছে আরও আগে। বাংলাদেশে এভাবে এত শিশুর মৃত্যু আগে কখনও ঘটেনি। সবাই জানে, কেন এই মৃত্যু। এনিয়ে সব গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কোন স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাহীন গাফিলতির একটি উদাহরণ মাত্র। ইউনিসেফের সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকা–সংকটের কথা বলে সতর্ক করেছিল। তারা ১০টি মিটিংয়ে সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে একই কথা জানিয়েছিল। ইউনিসেফ মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনায় দেশে সময়মতো টিকা আসেনি। এটি প্রমাণ করে এই শিশুদের আসলে হত্যা করা হয়েছে। যে হত্যার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা সবাই একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন, সাবেক সরকারের অবহেলায় কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত, এই ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেনি।

অনেক অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক, এনিয়ে মামলা দায়ের করার উদ্যোগ নেন কিন্তু তাদের মামলা আদালত গ্রহণ করেনি। সর্বশেষ এ বিষয়ে মামলার আবেদন করেছিলেন একজন জনপ্রতিনিধি। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মামলার আবেদন করেন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ব্যর্থতা ও মৃত্যুর ঘটনায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের এই আবেদনটি খারিজ করে দেয়া হয়।

এর আগে, সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে ব্যর্থতা অনুসন্ধানে একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠন কেন করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। গত ১৯ মে জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দিয়েছিলেন।

রুলে কেবিনেট সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের জবাব দিতে বলা হয়েছিল। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। তিনি জানান, চলমান শিশু মৃত্যুর ঘটনায় কারা দায়ী এবং কেন রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে তা অনুসন্ধানের জন্য একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠনের বিষয়ে রুল দিয়েছেন আদালত।

গত ১৭ মে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আশরাফুল ইসলাম হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটে হামের টিকা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে বেসরকারি খাতে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তদন্ত কমিটি গঠন এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ তার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। গত ৬ এপ্রিল এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এসব রিটে এখনও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া নেই, এ নিয়ে তদন্তে অনাগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধা কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়েই থাকবে।

অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার।

See More

Latest Photos