জনজীবন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত

Total Views : 13
Zoom In Zoom Out Read Later Print

সারাদেশে তীব্র লোডশেডিং চলছে। গ্যাস ও তেল সঙ্কটের কারণে জ্বালানি নির্ভর অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। ফলে লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে পড়েছে। রাতে দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গ্রামাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি গৃহিণীরা তাদের ফ্রিজে রাখা মাছ-গোশত নিয়েও বিপাকে রয়েছেন। পরীক্ষার আগেই ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। আজ (মঙ্গলবার) থেকে সারাদেশে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। বৈশাখের তীব্র গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ের কারণে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। অন্যদিকে কলকারখানার উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আমদানি রফতানি কার্যক্রম। ডিজেল ও বিদ্যুতের সংকটে মারাত্মক হুমকিতে রয়েছে বোরো উৎপাদন। দেশের মোট উৎপাদিত চালের ৬০ শতাংশ আসে বর্তমানে মাঠে থাকা বোরো থেকে। অর্থাৎ খাদ্য চাহিদার অর্ধেকের বেশি আসে এই বোরো থেকে। দেশের অনেক জেলায় বোরো ধানের শীষ এখন বের হচ্ছে। এ অবস্থায় জমিতে এখন সেচ দিতে না পারলে শীষ পুষ্ট হয়ে বের হবে না। অর্ধেক চিটা হয়ে যাবে। ফলে উৎপাদন অনেক কমে যাবে। তাই সম্পূর্ণ সেচনির্ভর এই ফসল টিকিয়ে রাখার জন্য কৃষকরা এখন যুদ্ধ করছেন। বিদ্যুৎ ও ডিজেল সঙ্কটের কারণে জমিতে সেচ নিয়ে কৃষক এখন দিশাহারা। দেশে এখন ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর প্রায় ২৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহার হয় কৃষিকাজে। দেশের ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রমও ডিজেলনির্ভর। পাশাপাশি ক্ষেত প্রস্তুত থেকে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্তও ডিজেল লাগে। সরকার লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোয় কৃষকের খরচ বাড়বে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। গত ১৮ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। হিসাব বলছে, এতে কৃষকের ব্যয় আগের চেয়ে বাড়বে প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেলে খরচ হতো ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। নতুন করে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা দাম বাড়ায় এখন ব্যয় হবে ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ ও এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। এছাড়া ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, কয়েক লাখ রিপারসহ মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্য যন্ত্র রয়েছে চার লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি। সব মিলে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি আছে, যার ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষি অর্থনীতিতে দুই ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া আরও কঠিন হবে। আবার বাজারে খাদ্যের দাম বাড়ায় গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের খরচ বাড়বে। বিশেষ করে চালের দাম বেড়ে গেলে গরিব মানুষের কষ্ট যেমন বাড়বে তেমনি অন্য খরচেও এর প্রভাব পড়বে। এতে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়বে যার প্রভাব পড়তে পারে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, স্বাভাবিকভাবে তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সবকিছুতে পড়ে। এতে নিশ্চিতভাবে কৃষকের খরচ বড় আকারে বাড়লো। সাশ্রয়ীভাবে মাঠে থাকা বোরো ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলো। ফলে চালের দাম বাড়বে। এখন কৃষকদের বর্ধিত এ ব্যয় ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে পুষিয়ে দিতে হবে। না হলে পরবর্তী উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। কারণ, কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামীবার উৎপাদন করবেন না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন সংকটের মধ্যেও পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে। দিনের বেলায় না হলেও রাতের কিছু সময় বিদ্যুতের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তা দিয়ে সেচ কার্যক্রম সচল রাখা যাচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিজেল সঙ্কটের কারণে সেচযন্ত্র সচল রাখা যাচ্ছে না। আবার লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম।

সারাদেশের লোডশেডিং ও ডিজেল সঙ্কটের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
রাজশাহী থেকে রেজাউল করিম রাজু জানান, জেলায় এখনো জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। সব পাম্প থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছেনা। ঈদের আগে থেকেই জ্বালানি সংকটে ভুগছে মানুষ। নানা রকম শর্ত দিয়ে তেল সরবরাহের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছেনা। রাজশাহী পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বলেন, ডিপো থেকে যা তেল পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে মটরসাইকেলের চাহিদা মেটানো যাচ্ছেনা। কৃষি কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থে প্রকৃত কৃষকদের উপজেলা পর্যায়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এবং নির্ধারিত পরিমাণ জারিকেন ও কনটেনারে করে জ্বালানি তেল সরবরাহের নির্দেশনা থাকলেও সব কৃষক এর ধারে কাছে যেতে পারছেনা। কারণ, পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল সরবরাহ আসছেনা। সব মিলিয়ে তেল নিয়ে তেলেসমাতি কারবার চলছে। রাজশাহী অঞ্চলের আবহাওয়া তেঁতে উঠেছে। তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৩৯ ডিগ্রী সেলসিয়াসের উপরে। পুড়ছে প্রকৃতি আর ফসলের ক্ষেত। জ্বালানি তেলে সংকটের মধ্যে তপ্ত আবহাওয়া যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া। জ্বালানি সংকটের কারণে ভেঙ্গে পড়েছে সেচ ব্যবস্থা। এখন ফসল বাঁচাতে হলে সেচের দরকার। এখানে সেখানে ছুটোছুটি করে পাচ্ছেন না তেল। ফলে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। তেলের অভাবে সেচযন্ত্র বন্ধ থাকায় পানির তৃষ্ণায় খা খা করছে ফসলের মাঠ, শুকিয়ে যাচ্ছে বোরো ধানসহ পটল, মরিচ ও পানের বরজ। এক লিটার জ্বালানির আশায় কৃষকরা মাইলের পর মাইল ছুটছেন। তানোরের কৃষক সদিদ জানান, জমিতে সেচ দেয়া যাচ্ছে না। পটলের আবাদ, মরিচের আবাদ, বোরো ধান সব ক্ষেত খরতাপে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র তাপাদহ পটলের গাছ মরে যাচ্ছে শুধু সেচের অভাবে।

চট্টগ্রাম থেকে রফিকুল ইসলাম সেলিম জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং চলছে। গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ফলে লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে পড়েছে। রাতে দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং জনজীবনে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। কলকারখানার উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আমদানি রফতানি কার্যক্রম। ডিজেল ও বিদ্যুতের সংকটে হুমকিতে পড়েছে বোরো ধানের আবাদ। সম্পূর্ণ সেচনির্ভর এই ফসল টিকিয়ে রাখার জন্য রীতিমতো লড়াইয়ে নেমেছেন প্রান্তিক চাষিরা। এই অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এবার রেকর্ড তিন লাখ ৮৩৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। কৃষকদের প্রচেষ্টায় আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তবে সেচের অভাবে ফলন টিকিয়ে রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সংকটের মধ্যেও পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে। দিনের বেলায় না হলেও রাতের কিছু সময় বিদ্যুতের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তা দিয়ে সেচ কার্যক্রম সচল রাখা যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিজেল সংকটের কারণে সেচযন্ত্র সচল রাখা যাচ্ছে না। আবার লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম। কৃষকরা বলছেন, বোরো মৌসুমে গড়ে চাষের জমিতে অন্তত ২০-৩০ বার সেচ দিতে হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রম পুরোদমে সচল রাখা যাচ্ছে না। এতে ফসলহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাছাড়া চট্টগ্রাম জেলাসহ অন্যান্য জায়গায় ভূগর্ভস্থ পানি সংকটের কারণে সেচ মৌসুমেও পানির ঘাটতি রয়েছে। সব মিলিয়ে কৃষক চলতি বোরো মৌসুমে আবাদ নিয়ে সংকট মোকাবিলা করছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্না বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এবার বোরো আবাদ বেড়েছে। সেচ নিয়ে এখনো কোন সঙ্কটের আশঙ্কা নেই। কৃষকদের জন্য বরাদ্দ দেয়া ডিজেল মিলছে। দিনের বেলায় কিছুটা সমস্যা হলেও রাতে বিদ্যুৎনির্ভর সেচযন্ত্র সচল রাখা যাচ্ছে।

বরিশাল থেকে নাছিম উল আলম জানান, তাপমাত্রার পারদ স্বাভাবিকের ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস ওপরে উঠে যাওয়ায় জমিতে পানি ধরে রাখতে বাড়তি দামেই অতিরিক্ত সেচ দিতে এবার বোরো ধানের উৎপাদন ব্যয় সাড়ে ১২শ টাকার ওপরে উঠে যাবে বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদগণও। কিন্তু উৎপাদিত ধান বিক্রি করে লাভ দূরের কথা খরচ উঠবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান বরিশালের কৃষিযোদ্ধাগণ। বরিশাল অঞ্চলের মাঠে থাকা প্রায় ৪ লাখ হেক্টর বোরো ধানের জমিতে সেচকাজে এবার যে প্রায় ৮৭ হাজার পাওয়ার পাম্প চলমান রয়েছে, তার প্রায় ৭৪ হাজারই ডিজেল চালিত। এসব পাম্পে গড়ে দৈনিক ৫ লক্ষাধিক লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও এতদিন সরবারহ নির্বিঘœ ছিলনা। অথচ ডিপোগুলোতে কোন জ্বালানি সরবরাহ থাকার মধ্যেই ডিলার পর্যায়ের সিন্ডিকেট কৃষকদের জিম্মি করে মজুত ডিজেল এখন বাড়তি দামে বিক্রি করছে। বরিশাল অঞ্চলের ৫টি তেল ডিপো থেকে কয়েক লাখ লিটার ডিজেলসহ পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে কোন ধরনের জ্বালানির সংকট না থাকলেও এতদিন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তা নিয়ে নানাভাবে প্রতারিত হয়েছেন কৃষকগণ। ফলে অনেক জমিতেই সেচ সংকট দেখা দেয়ায় থোর ও ফুল পর্যায়ে ধানের প্রয়োজনীয় খাবার দিতে পারেননি কৃষকগণ। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

ময়মনসিংহ থেকে মোঃ শামসুল আলম খান জানান, দেশব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের কৃষি খাতে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর কৃষিতে দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না কৃষকরা, ফলে ফসল উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব ও সরকার নির্ধারিত জ্বালানি সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে দেশজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। গতকাল সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা, হালুয়াঘাট, তারাকান্দা, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া, গফরগাঁও, নান্দাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ সেচ পাম্প বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় লোডশেডিংয়ের সময় এগুলো বন্ধ থাকে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করছেন, কিন্তু ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। হালুয়াঘাট উপজেলার কৃষক আব্দুল করিম জানান, আগে দিনে ২-৩ বার পানি দিতে পারতাম, এখন বিদ্যুৎ না থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ডিজেল দিয়ে সেচ দিতে গেলে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

সিলেট থেকে ফয়সাল আমীন জানান, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা। তার নেতিবাচক প্রভাবে সিলেটজুড়ে চলছে হাহাহার। এরমধ্যে বেড়েছে তেলের মূল্য। একেবারে অন্তরজ্বালা অবস্থা। তারপরও তেল সংকট পাম্পে পাম্পে। যদিও সংশ্লিষ্টরা অজুহাত দিচ্ছেন রেশনিং পদ্ধতিতে সরবরাহের। অপরদিকে, ঘন ঘন লোডশেডিং। বিভাগে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে লোডশেডিং। শহর এলাকায় ঘণ্টা দেড় ঘণ্টা পর বিদ্যুতের দেখা মিললেও গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ অবস্থা। বিদ্যুৎ বিভাগে এই চরম অবস্থা বিরাজ করলেও কোনো তথ্যই জানেন না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন। তিনি জানান, সিলেটের লোডশেডিং হচ্ছে- আমার জানা নেই। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নগরীর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে। বিভাগের কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে সব মিলিয়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম ভোগান্তি ও দুর্ভোগে পড়েছেন সিলেটের মানুষ। নাজুক পরিবেশ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে সিলেটের কৃষিখাতে। আগাম বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাওর বাঁওড় ও নিচু জমি। এতে বোরো ধান ঘরে তুলতে যেয়ে দিশাহারা কৃষক। এখানে সমস্যা থেমে নেই, ঝড়বৃষ্টিতের বজ্রপাতের সর্বনাশা থাবায় আতংক ছড়িয়েছে কৃষককুলে। সব হিসেবে চতুর্মুখী সংকটে এখন সিলেটের কৃষক।

খুলনা থেকে আসাফুর রহমান কাজল জানান, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি সেচ ব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। যার ফলে গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। খুলনায় জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের ফলে কৃষিতে সেচ সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কৃষকেরা বলছে, বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্পগুলো চালানো যাচ্ছে না। ফলে বোরো ধানের ক্ষেতে পানি দেয়া যাচ্ছে না। ধানের ফুল আসার সময় বা পানি দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ দিতে না পারায় ধানের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, কয়রা ও আশেপাশের এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ কাজ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

কুষ্টিয়া থেকে এস এম আলী আহসান পান্না জানান, বিশ্বজুড়ে উত্তেজনার প্রভাবে কুষ্টিয়ায় জ্বালানি তেলের বাজারে সাময়িক অস্থিরতা দেখা দিলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং কিছু অসাধু চক্রের মুদি দোকানে চড়া দামে তেল বিক্রির কারণে চালক ও কৃষকরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়েছেন ঠিকই, তবে এই নৈরাজ্য ঠেকাতে প্রশাসনের বহুমুখী উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে পল্লীবিদ্যুতের ঘাটতিও কৃষকদের সেচ কাজে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং সবার কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিতে গ্রামাঞ্চলে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি বর্তমানে রেশনিং পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ না মিললেও একটি সুশৃঙ্খল রুটিনের মাধ্যমে কৃষকরা সেচের সুযোগ পাচ্ছেন, যা ফসলের সম্ভাব্য বড় ক্ষতি এড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুমিল্লা থেকে সাদিক মামুন জানান, জ্বালানি সংকট ও বৈশাখের ভ্যাপসা গরমের মধ্যে কুমিল্লা জুড়ে শুরু হয়েছে বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং। প্রতিদিনের লোডশেডিং জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে এবং কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘœ ঘটাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে দিনে-রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে বোরো আবাদসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেতে পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে।

মাগুরা থেকে সাইদুর রহমান জানান, জ্বালানি তেলের অব্যাহত তীব্র সংকটে মাগুরার চার উপজেলার কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। তেলের অভাবে চলতি ইরি বোরো মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে জেলায় ধানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার কৃষি বিভাগ বলছে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া ও পরিবেশ ভালো থাকায় জেলায় ধানের বাম্পার ফলন হবে। কিন্তু বর্তমানে তেলের সংকট থাকায় ধানের অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ফরিদপুর থেকে আনোয়ার জাহিদ জানান, ফরিদপুরে জ্বালানি তেল সংকট প্রচ- তাপদহনে পুড়ছে বীজতলা, সাথে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের ভেলকিবাজি খেলা। সব মিলিয়ে কৃষি সেক্টরে ম্যাসাকার অবস্থা। তেল না পাওয়া জেলার বিভিন্ন জায়গায় কৃষি কাজে সেচ সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। তেলের দাম বাড়লেও সংকট কাটেনি।

রংপুর থেকে হালিম আনছারী জানান, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বোরো চাষে বাড়তি খরচে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা। এমনিতেই সার, বীজ ও কীটনাশকসহ সব ধরনের কৃষি উপকরণের বাড়তি দামের কারণে গত মৌসুমের তুলনায় এবার বোরো উৎপাদনে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। তার ওপর মওসুমের মাঝ পর্যায়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। কৃষকরা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের বাড়তি মূল্যের সাথে লোডশেডিংয়ের কারণে এমনিতেই বাড়তি খরচ হচ্ছে। তার ওপর ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি আমাদের মাথায় বজ্রাঘাতের মত। সব কিছুর দাম বাড়ায় কোনোটাই আর আগের দামে পাওয়া যাচ্ছে না।
নাটোর থেকে মোঃ আজিজুল হক টুকু জানান, দেশের শস্য ভা-ার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের চলনবিল বিধৌত নাটোরে এবছর বোরো ধানের বাম্পার আবাদ হয়েছে। নাটোর সদর, নলডাঙ্গা, সিংড়া এবং গুরুদাসপুর উপজেলার বিল এলাকার কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল হলো এই বোরো ধান। অনুকূল আবহাওয়া, পোকামাকড়ের উপদ্রব না হওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধার কারণে এবছর বোরো ধানের আবাদ অনেক ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলার কৃষকরা।

শেরপুর থেকে এস. কে. সাত্তার জানান, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বোরো মওসুমের ভরা সময়ে তীব্র ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের অভাবে সেচ পাম্পগুলো বন্ধ থাকায় বোরো ধানের আবাদ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। মাঠের পর মাঠ পানিশূন্য হতে শুরু করেছে কৃষকের স্বপ্ন বোরো ধানের ক্ষেত। কৃষকদের অভিযোগ, কতিপয় অসাধু ডিলাররা সরকারের বর্ধিত নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নিচ্ছেন। এছাড়া চাহিদার তুলনায় সরবরাহ নেই বলে তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে জেলায় বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ থেকে মো. জাহাঙ্গীর শাহ্ বাদশাহ জানান, দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষিতে। ঠিক যখন ফসল ঘরে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, তখনই এই সংকট যেন কৃষকদের সামনে নতুন এক অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলে দিয়েছে।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে মো. আতিকুল্লাহ জানান, উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে গত কয়েক দিন ধরে লাগামহীনভাবে বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। এতে গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দিন-রাত একটানা লোডশেডিংয়ের কারণে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পগ্রাহকদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানামুখী কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কৃষিখাতে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

See More

Latest Photos